
ফাহাদ-ই-আজমঃ- নাগরিক সেবা আধুনিক ও দ্রুত করার লক্ষ্য নিয়ে সাভার পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্স ও হোল্ডিং ট্যাক্স ব্যবস্থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং নতুন সফটওয়্যার চালুর পর সেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ী ও পৌরবাসী। একই সঙ্গে সফটওয়্যার নির্বাচন, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পৌরসভা সূত্র ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি ট্রেড লাইসেন্স ও হোল্ডিং ট্যাক্স ব্যবস্থাপনায় নতুন সফটওয়্যার চালু করা হয়। কিন্তু সফটওয়্যারটি চালুর পর থেকেই পুরোনো তথ্য খুঁজে না পাওয়া, লাইসেন্স নম্বর পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া, তথ্য প্রদর্শনে ত্রুটি এবং সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতার মতো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রতিদিন শত শত মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা ছাড়াই ফিরতে হচ্ছে।
সরেজমিনে পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স শাখায় গিয়ে দেখা যায়, সেবাপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ সারি। কেউ লাইসেন্স নবায়ন করতে এসে পুরোনো তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করছেন, আবার কেউ নতুন আবেদন জমা দিয়েও নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন না। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে একাধিকবার বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে।
পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী রুপোকুর রহমান বলেন, বছরের পর বছর নিয়ম মেনে লাইসেন্স নবায়ন করেছি। এবার এসে জানানো হলো, আগের কোনো তথ্য নেই। সবকিছু নতুন করে জমা দিতে হবে। এতে সময় ও অর্থ দুই-ই নষ্ট হচ্ছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যেও নতুন সফটওয়্যার নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আগের ডাটাবেজের সঙ্গে নতুন সফটওয়্যারের সমন্বয় না থাকায় কাজের গতি কমে গেছে। প্রতিদিন জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে।
সাভার পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছামসুদ্দিন বলেন, সফটওয়্যার পরিবর্তনের বিষয়ে মাসিক সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তার দাবি, সিদ্ধান্তটি প্রশাসনিকভাবে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সফটওয়্যার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবেক কর নির্ধারক নাজমুল আলমের পারিবারিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে তথ্য নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
ট্রেড লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আবদুল মোত্তালিব বলেন, নতুন সফটওয়্যারের কারণে আমরাও সমস্যার মধ্যে আছি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম না।
ট্যাক্স আদায়কারী মিজানুর রহমানও বলেন, সফটওয়্যারটি ব্যবহারে নানা কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, হোল্ডিং, কর ও সম্পত্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তাদের মতে, এমন সংবেদনশীল তথ্য পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা মান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক কর নির্ধারক নাজমুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, সফটওয়্যার সংক্রান্ত বিষয়ে পৌরসভার প্রশাসক বিস্তারিত বলতে পারবেন।
অন্যদিকে পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নিমেক্স সফটওয়্যার অন্য কয়েকটি পৌরসভাতেও কাজ করেছে। নতুন সিস্টেম চালুর শুরুতে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়েছে। সেগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে নাগরিকরা নির্বিঘ্নে সেবা পান।
সাভার উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন খান নঈম বলেন, ডিজিটালাইজেশনের উদ্দেশ্য জনগণের দুর্ভোগ কমানো। কিন্তু পরিকল্পনা ও দক্ষতার অভাবে যদি মানুষ হয়রানির শিকার হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তাও সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রথম শ্রেণির একটি পৌরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, তথ্য নিরাপত্তা, কারিগরি সক্ষমতা ও সরকারি নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় নাগরিক সেবা সহজ করার উদ্যোগই জনভোগান্তির নতুন কারণ হয়ে উঠতে পারে।
Asian Barta