
এশিয়ান বার্তা ডেস্ক:-ঘূর্ণিঝড় মিগজাউমের প্রভাবে ঢাকাসহ সারা দেশে দুই দিন হালকা বৃষ্টি হয়।এরপর তাপমাত্রা এক থেকে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়।এতে বৃষ্টির কারণে শীত অনুভূত হচ্ছিল।ডিসেম্বরের এ বৃষ্টির ফলেই রাজধানীতে শীত পড়বে বলে মনে হচ্ছিল।
তবে আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ঠান্ডা অনুভূত হলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেছে। জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমার পর শীত অনুভূত হবে।তবে ঠিক কবে থেকে শীতকাল শুরু হতে পারে এবং এবারের শীত কতটা তীব্র হবে? আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হলেও দেশের উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা কমতে শুরু করে নভেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে, যেটার খুব একটা তারতম্য হয়নি এবারও। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতি কিছুটা পাল্টে গেছে; যার কারণে শীতকালের সময় এবং ধরন ঠিক আগের মতো হচ্ছে না।
এদিকে আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকে সারা দেশের রাতের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে (১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম)। অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলাসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। শেষরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সারা দেশে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। আজ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রংপুর বিভাগের সৈয়দপুরে ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় ১৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়াবিদরা বলেন, সাধারণত স্বস্তিদায়ক তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে বোঝানো হয়। আর ডিসেম্বর মাস থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের সময়কালকে শীতকাল হিসেবে ধরা হয়।‘মিগজাউমের’ প্রভাবে এই বৃষ্টিপাতের পর এই মাসের ১০ তারিখের পর থেকে তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু হবে বলে জানাচ্ছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তবে ত্তরাঞ্চলে কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে আসতে পারে বলে জানান তিনি।
এটিকে শৈত্যপ্রবাহ হিসেবেও দেখা যায়, কারণ, শীতকালে ২.৬ থেকে শুরু করে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে গেলে সেটা শৈত্যপ্রবাহের পর্যায়ে পড়ে।
গত ৩০ বছরের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদ দেখেছেন, ডিসেম্বর মাসে সাধারণত একটি থেকে দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা থাকে। শীতকালের শুরুটা মূলত ডিসেম্বর মাসের শেষার্ধের দিকে অর্থাৎ ১৬ তারিখের পর কোনো একটা সময় থেকে হবে।
আবহাওয়াবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বৃষ্টিপাতের পরপর তাপমাত্রা কমে শীত অনুভূত হলেও প্রকৃত অর্থে এটি শীতকাল নয়। সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পাশাপাশি যখন আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে বায়ুমণ্ডল পুরোপুরি শুষ্ক হয়ে গেলে শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তবে সেটা হতে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা।
আবহাওয়াবিদ মান্নান বলেন, ‘এ মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে একটা মৃদু শৈত্যপ্রবাহ আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সেটি পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ মাসের দ্বিতীয়ার্ধ, অর্থাৎ ১৬ তারিখের পর থেকে মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যে প্রকৃত অর্থে শীতকাল শুরুর সম্ভাবনা দেখছেন তিনি যখন রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামবে।
বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরু হবার পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গরম পড়েছিল এ বছরেরই জুন মাসে। আমেরিকা ও ইউরোপের মতো শীতপ্রধান জায়গায় তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করেছে মানুষ। বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রার উচ্চতম রেকর্ড ছুঁয়েছে, যার একটা প্রধান কারণ ছিল ‘এল নিনো’ নামে প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্র।
এই ‘এল নিনো’ ও একই সঙ্গে বিশ্বের বাড়তে থাকা তাপমাত্রার প্রভাবে এবারের শীতকালটা আগের তুলনায় কিছুটা উষ্ণ হওয়ার কথা জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এল নিনো সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে যে অবস্থাটা মে মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং এল নিনো সক্রিয় থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকের চেয়ে সাধারণত বেশি তাপমাত্রা দেখা যায়, বলছিলেন আবহাওয়াবিদ মল্লিক।
প্রতি তিন থেকে সাত বছরের মধ্যে একবার এই এল নিনো দেখা দেয়- যখন তাপমাত্রা ঊর্ধমুখী হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৩০ বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার গড় হিসাবে স্বাভাবিকভাবে ডিসেম্বর মাসে সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১৪.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। এ বছর ডিসেম্বর মাসে সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।
পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার গড় চিত্রের দিকে তাকালে তাপমাত্রা বাড়তে থাকার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
৩০ বছরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে যেটাও এবার সামান্য বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ তথ্য অবশ্য পুরো দেশজুড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা, যা রেকর্ড করা হয় তার গড় হিসাব। অঞ্চলভেদে তাপমাত্রার তারতম্য হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এবার তেমন শীত পড়বে না সেটা ভাবলেও ভুল হবে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আবহাওয়ার ব্যাপারে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না আবহাওয়াবিদ মান্নান বলছেন, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের এই সময়ে যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। গত তিন মাসে পরপর কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া বিরূপ আচরণ করলে শর্ট পিরিয়ডে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ আসার সম্ভাবনাকেও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটুকু বলা যায় যে সামগ্রিকভাবে এবার শীতের সময় কিছুটা ওয়ার্ম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে শীতের সময়কালেরও কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ডিসেম্বর মাসকে শীত শুরু হওয়ার স্বাভাবিক সময় হিসেবে ধরা হলেও আগের তুলনায় শুরুর সময়টা পেছানোর প্রবণতা দেখছেন আবহাওয়াবিদ মল্লিক। তবে শীতের সময়কাল কম লক্ষ্য করছেন তিনি।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গত কয়েক বছর ধরে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের পর তেমন শীত অনুভূত হয় না। এমনকি, গত কয়েক বছরে জানুয়ারি মাসেও আমাদের এক্সপেক্টশন অনুযায়ী শীতের অনুভূতি আসেনি বলছিলেন তিনি।
এছাড়া শৈত্যপ্রবাহের ব্যাপ্তিকালেও পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন আবহাওয়াবিদরা। শীতল রাত কত সময় ধরে চলবে, সেদিকে ২০১৫ সালের পর থেকে পরিবর্তন হয়েছে। কত সময় ধরে শৈত্যপ্রবাহ চলবে সেই হিসাবে তীব্র ও মাঝারি ধরণের শৈত্যপ্রবাহ কমে গেছে।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ভিত্তিতে অন্তত তিন দিন স্থায়িত্বকাল অনুযায়ী শৈত্যপ্রবাহকে চারটি। ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মৃদু শৈত্যপ্রবাহ; ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি মাঝারি; ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি তীব্র আর ৪ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা থকেলে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলে।
মৃদু শৈত্যপ্রবাহ এখন আগের তুলনায় বেশি সময় ধরে থাকছে এবং মাঝারি থেকে অতি তীব্র ধরণের তাপমাত্রার দিনসংখ্যা কমে আসছে। জানুয়ারি মাস নাগাদ সাধারণত একটি থেকে দুটি মাঝারি থেকে তীব্র ধরণের শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা থাকে- যেটা এবারও থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে আবহাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বাভাস দেওয়ার সমস্যার দিকও রয়েছে। যেমন ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর্যন্ত মোটামুটি সঠিক হিসাব পাওয়া যায়। এরপর যত বেশি সময়ের হিসেব করা হয়, তত সেটা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকে।
পাঁচ দিনের হিসাব করলে সেটা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশে নেমে আসে আর সাত দিন পর্যন্ত গেলে সেটা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে নেমে আসে বলে জানান আবহাওয়াবিদরা।
Asian Barta