
ফাহাদ-ই-আজমঃ- ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এখন অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আলোচনায়। মহাসড়কের পাশে ফুটপাত এবং সংলগ্ন আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার ও অস্থায়ী দোকানপাট। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকান, হকার, অটোরিকশা ও সিএনজি থেকে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। এতে একদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে সংকুচিত হয়ে পড়ছে সড়ক ও ফুটপাত—বাড়ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ব্যবসায়ী, হকার, পরিবহনচালক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের কথা জানা যায়।
হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের চা বিক্রেতা আফজল মিয়া বলেন, ‘চা বিক্রি করে আর কত টাকা আয় করি। কিন্তু নেতাদের প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। টাকা না দিলে সড়কের আশপাশে দাঁড়াতেও দেয় না। তবে কার কাছে তিনি এই টাকা দেন—এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি আফজল। তাঁর ভাষ্য, নাম প্রকাশ করলে পরে সমস্যায় পড়তে পারেন।
স্থানীয় একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অভিযোগ, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাত ও সড়কের ওপর বসানো কাঁচাবাজার এবং অস্থায়ী দোকান থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করা হয়। তাঁদের দাবি, মুকুল, সাগর, রমজান ও জাকির নামের কয়েকজন এই টাকা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্ধারিত অঙ্কের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। কেউ কেউ শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পরও ফের একই অভিযোগ। চাঁদা আদায়ের অভিযোগে আলোচনায় থাকা মুকুলকে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট রাতে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের কাঁচাবাজার থেকে টাকা তোলার সময় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সাগরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। অন্যদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ নম্বরও পাওয়া যায়নি।
মোবাইল অ্যাকসেসরিজ বিক্রেতা ইলিয়াসসহ কয়েকজন হকার জানান, দোকানের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দিতে হয় বলে তাদের অভিযোগ।
হকারদের দাবি, নির্ধারিত টাকা দেওয়ার পরই ফুটপাতে ব্যবসা করার সুযোগ মেলে। ফলে বাধ্য হয়েই অনেকে টাকা দেন। শুধু দোকান ও হকার নয়, হেমায়েতপুরের সড়কগুলোতে চলাচলকারী অটোরিকশা থেকেও প্রকাশ্যে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, রফিক, রহিম ও রিপনসহ কয়েকজন এই খাতে টাকা তোলেন।
অন্যদিকে হেমায়েতপুর-কেরানীগঞ্জ ও হেমায়েতপুর-সিংগাইর আঞ্চলিক সড়কে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার চালকদেরও চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
চালকদের অভিযোগ, ঢাকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন-এ গ্যাস নিতে এলে তাঁদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না চাইলে সিরিয়াল থেকে বের করে দেওয়া এবং গাড়ি চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক।
হেমায়েতপুরের সিএনজি চালক মতিউর বলেন, গ্যাস নিতে এলেই টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নানা সমস্যা করে। বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হয়। চাঁদা আদায়ের সঙ্গে মমিন ও তাজুল নামের দুই ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, দোকানপাট, হকার ও পরিবহন খাত থেকে সংগৃহীত অর্থ দিনশেষে সাদ্দাম হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছে জমা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় আসামি থাকার কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন।
তবে চাঁদা আদায়ের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ফুটপাত কাঁচাবাজার বা দোকান থেকে টাকা তোলার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। আমার নামে কে অভিযোগ করছে, তাকে সামনে আনা হোক। যারা টাকা তোলে, তাদেরও আমি চিনি না।
এদিকে স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, চাঁদাবাজির টাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের কাছেও পৌঁছায়। এমনকি হাইওয়ে পুলিশ ও ট্যানারি ফাঁড়ির পুলিশের মধ্যে এর ভাগ-বাটোয়ারা হয়—এমন অভিযোগও স্থানীয়ভাবে রয়েছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাভার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য আমরা পরিকল্পনা করছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে চাঁদার টাকা হাইওয়ে পুলিশকে দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারা চাঁদা তোলে, তথ্য পেলে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম শিগগিরই উচ্ছেদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাত ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুটপাত ও সড়কের একাংশ দখল করে দোকানপাট বসানোর কারণে পথচারীদের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে পণ্য ও দোকানের মালামাল রাখায় যানবাহন চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে ব্যস্ত সময়ে হেমায়েতপুর এলাকায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে। বড় মার্কেট ও বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরাও এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, ফুটপাতেই বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি হওয়ায় অনেক ক্রেতা মূল মার্কেটে না গিয়ে সেখান থেকেই কেনাকাটা করছেন।
সাভার নাগরিক কমিটি,সাধারণ সম্পাদক,মোঃ সালাহউদ্দিন খান নঈম বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, এর নেপথ্যে থাকা অর্থ আদায়ের ব্যবস্থাও বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। থানায় নতুন যোগদানের পর বিভিন্ন সভা ও বৈঠকে ব্যস্ত থাকার কারণে নিয়মিত থানায় সময় দিতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে সরাসরি সাক্ষাৎ করেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
Asian Barta