
ফাহাদ-ই-আজমঃ- আশুলিয়ায় দম্পতি ও নবজাতকের মরদেহ উদ্ধারে ঘনীভূত রহস্য—দুই মাসে ঘরবন্দী লাশের দুটি ঘটনা, ভাড়াটিয়া যাচাই নিয়ে প্রশ্ন!
একটি কক্ষ। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। ভেতরে স্বামী-স্ত্রী ও তাঁদের সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ। কয়েক দিন ধরে বন্ধ থাকা সেই কক্ষের দরজা খোলেনি কারও। শেষ পর্যন্ত তীব্র দুর্গন্ধই জানিয়ে দিল ভেতরের ভয়াবহতার কথা।
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার মধ্য জামগড়া এলাকায় শনিবার গভীর রাতে এই তিন মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে। তবে কীভাবে তিনজনের মৃত্যু হলো, কখন হলো, তাঁদের সঙ্গে আর কে বা কারা ছিলেন, মৃত্যুর পর কক্ষটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করল কে—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনো মেলেনি।
নিহতদের পরিচয়ও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনার ধরন, কক্ষের অবস্থা এবং নিহত পুরুষের গলায় গামছা প্যাঁচানো থাকার বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে মরদেহ তিনটি অর্ধগলিত হয়ে যাওয়ায় মৃত্যুর সঠিক সময় ও ঘটনাপ্রবাহ নির্ধারণেও তদন্তকারীদের সামনে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
দুর্গন্ধ থেকে বেরিয়ে এল ভয়াবহতা
মধ্য জামগড়ার হাজী হযরত আলীর চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ গত ৯ আগস্ট স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে দুজন ভাড়া নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বাসা নেওয়ার পর ওই কক্ষের দরজা-জানালা বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকত। তাঁদের চলাফেরাও প্রতিবেশীদের নজরে খুব একটা আসেনি।
শুক্রবার রাতে হঠাৎ কক্ষটির আশপাশে তীব্র পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় প্রতিবেশীদের মধ্যে। পরে তাঁরা পুলিশকে খবর দেন।
আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে, কক্ষটির দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। পরে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ। সেখানেই পাওয়া যায় তিনটি মরদেহ—একজন পুরুষ, একজন নারী এবং একটি নবজাতক।
মরদেহগুলো অর্ধগলিত হওয়ায় নিহতদের বয়স, পরিচয় এবং মৃত্যুর সময় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে একটি বিষয় তদন্তকারীদের বিশেষভাবে ভাবাচ্ছে—ঘরটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল কেন?
তালা ঘিরেই যত প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকলে অপরাধের পর হত্যাকারী কীভাবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করল, সেটি এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কক্ষটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করার অর্থ কি হত্যাকারী পরিচিত কেউ ছিলেন? নাকি অন্য কোনো কারণে ঘরটি বন্ধ ছিল? পুলিশ অবশ্য এখনো এসব প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি।
তদন্তকারীরা কক্ষটির দরজা, তালা, জানালা ও আশপাশের স্থান থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছেন। ভবনের অন্য বাসিন্দা, বাড়ির মালিক এবং স্থানীয়দের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। দম্পতি কখন শেষবার বাইরে বেরিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করতেন, কেউ তাঁদের খোঁজ নিতে এসেছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ঘরটি ভাড়া দেওয়ার সময় বাড়ির মালিক তাঁদের পরিচয় কীভাবে যাচাই করেছিলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্য কোনো নথি নেওয়া হয়েছিল কি না, ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব প্রশ্নের কোনো একটিকে ঘটনার কারণ বা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ফরেনসিক পরীক্ষায় মিলতে পারে সূত্র
ঘটনাস্থলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে নিহত পুরুষের গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এটি মৃত্যুর কারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নবজাতকটির পরিচয় ও জন্মের বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিশুটি ওই দম্পতির সন্তান কি না, কোথায় এবং কখন তার জন্ম হয়েছিল—এসব তথ্যও তদন্তকারীদের সামনে আসতে পারে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত হলে তদন্তের একটি বড় জট খুলবে। তাঁদের মোবাইল ফোন, যোগাযোগের তথ্য, পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক লেনদেন এবং বাসা ভাড়া নেওয়ার কারণ—সবকিছুই তখন খতিয়ে দেখা সম্ভব হবে।
ডিবি-থানা একসঙ্গে তদন্তে
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, গত ৯ আগস্ট স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওই কক্ষ ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাইরে থেকে কক্ষটি তালাবদ্ধ দেখতে পায়। পরে তালা ভেঙে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। হত্যার কারণ উদঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পুলিশের একাধিক দল তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে আশুলিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশও কাজ করছে।
দুই মাসে দ্বিতীয় ঘরবন্দী মরদেহ
এই ঘটনার আরেকটি উদ্বেগের দিক হলো—আশুলিয়ায় অল্প সময়ের ব্যবধানে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা। গত ১৯ আগস্ট ভাদাইল পশ্চিমপাড়া এলাকায় আব্দুর রহমান (৫) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, নিখোঁজ হওয়ার প্রায় তিন ঘণ্টা পর একটি চারতলা ভবনের ছাদ থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মুখ ও গলায় লাল স্কচটেপ প্যাঁচানো ছিল।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এবার একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে—এমন কোনো তথ্য এখনো পুলিশের পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি। ফলে শুধু সময়ের নৈকট্যের ভিত্তিতে দুটি ঘটনাকে একই সূত্রে দেখার সুযোগ নেই।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি?
আশুলিয়া দ্রুত শিল্প ও আবাসিক এলাকা হিসেবে বিস্তৃত হলেও ভাড়াটিয়াদের পরিচয় যাচাই, বাড়িওয়ালার তথ্য সংরক্ষণ এবং আবাসিক ভবনের নজরদারি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। নতুন বাসিন্দা এসে দিনের পর দিন একটি কক্ষে অবস্থান করলেও প্রতিবেশীদের কাছে তাঁদের পরিচয় স্পষ্ট না হওয়া—এই ঘটনার পর সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। তবে শুধু বাড়িওয়ালা বা স্থানীয়দের দায়ী করার আগে তদন্তে দেখা প্রয়োজন, ওই দম্পতি প্রকৃত পরিচয়ে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন কি না, তাঁদের পরিচয়পত্র যাচাই হয়েছিল কি না এবং তাঁরা নিয়মিত সেখানে বসবাস করতেন কি না।
এখন তদন্তের কেন্দ্রে কয়েকটি প্রশ্ন
তদন্তকারীদের সামনে আপাতত কয়েকটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—তিনজনের মৃত্যু কখন হয়েছে? মৃত্যুর কারণ কী? কক্ষটি বাইরে থেকে কে তালাবদ্ধ করেছিল? নিহত দম্পতির প্রকৃত পরিচয় কী? তাঁদের সঙ্গে কারও বিরোধ বা যোগাযোগ ছিল কি না? বাসাটি ভাড়া নেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে কারা দেখা করেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো পরিষ্কার হবে, এটি নিছক একটি রহস্যজনক মৃত্যু, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো কারণ। এই মুহূর্তে নিশ্চিত শুধু একটি বিষয়—একটি তালাবদ্ধ ঘর খুলে পুলিশ উদ্ধার করেছে তিনটি নিথর দেহ। আর সেই দরজার তালার চাবি, তিনটি মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার পেছনের মানুষগুলো খুঁজে বের করাই এখন তদন্তকারীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Asian Barta