
ফাহাদ-ই-আজমঃ সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্সের বৈধতা, চিকিৎসকদের যোগ্যতা এবং অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগের ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত জনবলের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে চিকিৎসায় অবহেলা কিংবা রোগীর মৃত্যু নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগে চিকিৎসকের যোগ্যতা যাচাই জরুরি
অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি চিকিৎসাপদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। সাভার-আশুলিয়ার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে কারা অ্যানেসথেশিয়া সেবা দিচ্ছেন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
পাশাপাশি অপারেশন থিয়েটারের পরিবেশ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, অক্সিজেন ও জরুরি সহায়তা, প্রশিক্ষিত নার্সের উপস্থিতি এবং অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা পরিদর্শন করা প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারে জটিলতা দেখা দিলে রোগীকে উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের কার্যকর ব্যবস্থাও রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স যাচাইয়ের দাবি
সাভার-আশুলিয়ায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনায় প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা, অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা, চিকিৎসক ও নার্সের তালিকা এবং বাস্তবে তাঁদের উপস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।
রোগীকে চিকিৎসার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো, অস্ত্রোপচারের সম্মতি নেওয়া, চিকিৎসার নথি সংরক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অভিভাবকের কাছ থেকে সম্মতিপত্র বা মুচলেকা নেওয়া হয়েছে বলেই কোনো প্রতিষ্ঠান চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্ত হবে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ ও দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রযোজ্য আইন ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।
সাভারের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তালিকা
সাভার-আশুলিয়া এলাকার বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাইয়ের জন্য সরবরাহ করা তালিকায় রয়েছে—আন্-নূর চক্ষু হাসপাতাল অ্যান্ড ফ্যাকো সেন্টার, আফনান হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, আবুল হোসেন হাসপাতাল, আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতাল, আলমাস চক্ষু হাসপাতাল, আশরাফ আলেয়া হাসপাতাল, আশুলিয়া চক্ষু হাসপাতাল (প্রা.) লিমিটেড, আয়েশা হাসপাতাল, ইউনিক হাসপাতাল, ইলিয়াস হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেড, ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইসলামিয়া ডিজিটাল ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতাল, এনাম ক্যান্সার হাসপাতাল লিমিটেড, এনাম মেডিকেল হাসপাতাল (প্রা.) লিমিটেড, কৈননিয়া মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার, ক্রিয়েটিভ ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জামাল ক্লিনিক, জাহানারা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জিরাবো সিটি হাসপাতাল, ডক্টরস জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, থ্যালাসেমিয়া হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট, দি ল্যাবএইড হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দীপ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দীপ জেনারেল হাসপাতাল, নাগরিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র, নারী-শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাসপাতাল, নাহার জেনারেল হাসপাতাল, নিউ দীপ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিউ পপুলার হাসপাতাল, নিউ লাইফ কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিউ সেবা হাসপাতাল, নিউ হোপ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নোভা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পলাশ হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক (প্রা.) লিমিটেড, পিএমকে হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পিপলস জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পিয়ারলেস স্পেশালাইজড হাসপাতাল, প্রিন্স ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি অ্যান্ড হাসপাতাল, ফাইলেরিয়া অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক হেলথ কেয়ার, ভার্ক মা ও শিশু হাসপাতাল, মডার্ন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মাইরা ইউনিক হাসপাতাল, মাউন্ট ভিউ হেলথ সিটি, মেরি স্টোপস—সাভার, রহমান স্পেশালাইজড হাসপাতাল, রাজু জেনারেল হাসপাতাল, রেজিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রেমিডি জেনারেল হাসপাতাল, রোজ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব জোন, ল্যাব স্টার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকস, সাফাত ক্লিনিক, সাভার আই হাসপাতাল অ্যান্ড ফ্যাকো সেন্টার, সাভার আধুনিক হাসপাতাল, সাভার ইউনাইটেড হাসপাতাল, সাভার কেয়ার হাসপাতাল, সাভার ক্রাউন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সাভার জেনারেল হাসপাতাল, সাভার নিউ মুক্তি হাসপাতাল, সাভার প্রাইম হাসপাতাল, সাভার সেন্ট্রাল চক্ষু হাসপাতাল, সাভার সেন্ট্রাল হাসপাতাল, সাভার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, সাভার হেলথ কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সাহারা মডার্ন হাসপাতাল, সিটি ল্যাব হাসপাতাল, সীমা জেনারেল হাসপাতাল, সুপার মেডিকেল হাসপাতাল, সেবা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সোহেল স্কয়ার হাসপাতাল, স্ট্যান্ডার্ড হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হযরত সৈয়দ আলমীর হোসেন কাঞ্চনপুরী ডিজিটাল ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতাল, হাবিব হাসপাতাল, হিলিং এইড হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, হেমায়েতপুর চক্ষু হাসপাতাল, হেমায়েতপুর সেন্ট্রাল হাসপাতাল এবং হ্যাপি জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
তালিকাভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, লাইসেন্স, জনবল ও চিকিৎসাসেবার মান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তালিকাভুক্ত থাকা মানেই কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে—এমন নয়।
প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ছাড়া অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগে ঝুঁকি
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেশিয়া) ও সাভার উপজেলা অ্যানেসথেশিয়া কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. নাজমুল হুদা মিঠু বলেন, সাভার উপজেলায় অ্যানেসথেশিয়ায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১২ জন। অথচ এলাকার অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটারে কারা অ্যানেসথেশিয়া সেবা দিচ্ছেন কিংবা অস্ত্রোপচারের আগে রোগীদের অজ্ঞান করছেন, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
তিনি আরও বলেন, শুধু এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করলেই একজন চিকিৎসক অ্যানেসথেশিয়ায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হন না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃত উচ্চতর যোগ্যতা থাকা জরুরি।
ডা. নাজমুল হুদা মিঠু বলেন, রোগীকে অজ্ঞান করার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা, শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা মোকাবিলায় বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা ছাড়া এ দায়িত্ব পালন করলে রোগীর জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন ও স্বীকৃত যোগ্যতাসংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, চিকিৎসকদের পেশাগত যোগ্যতা ও বিশেষজ্ঞ পরিচয়ের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। তাই অ্যানেসথেশিয়া সেবা প্রদানকারী চিকিৎসকদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি।
চিকিৎসায় অবহেলা, অদক্ষতা কিংবা প্রযোজ্য আইন লঙ্ঘনের কারণে কোনো রোগীর গুরুতর শারীরিক ক্ষতি বা মৃত্যু হলে ঘটনার প্রকৃতি ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অবহেলাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারাসহ প্রাসঙ্গিক আইন প্রযোজ্য হতে পারে।
অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগে যোগ্যতা নিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফজলে বারীর কাছে অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগের যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমবিবিএস চিকিৎসক উচ্চতর প্রশিক্ষণ থাকলে রোগীকে অজ্ঞান করতে পারবেন।
তাঁর বক্তব্যের পর অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগে কী ধরনের প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃত যোগ্যতা প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের আলোকে স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স যাচাই, নিয়মিত পরিদর্শন এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যথাযথ ভূমিকা পালন করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। কোনো অনিয়ম বা তদারকিতে অবহেলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা নথিপত্র ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
রোগীর নিরাপত্তায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি
সাভার-আশুলিয়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স ও চিকিৎসকদের যোগ্যতা যাচাই, অ্যানেসথেশিয়া সেবার মান পরীক্ষা এবং রোগীদের অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিদর্শনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এলাকার স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি রোগী ও তাঁদের পরিবারের আস্থাও বাড়বে।
Asian Barta